‘মসজিদে গেলেও সবাই এমনভাবে তাকায় যেন অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি’

‘মসজিদে গেলেও সবাই এমনভাবে তাকায় যেন অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি’

খাদ্য সহায়তা চেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে ফোন করে শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছে তার পারিবার। আত্নীয়-স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন এবং কারখানার লোকজন তাকে আড়চোখে দেখছে। ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘মসজিদে গেলেও সবাই এমনভাবে তাকায় যেন আমি অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি।’

তার পরিবার বলছে, আগের মতো ঘর থেকে বের হচ্ছেন না ফরিদ। কিছুক্ষণ পরপর মাথায় হাত দিয়ে কী যেন চিন্তা করছেন। বলছেন, লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশ্যে সাহায্য চাইতে না পেরে ৩৩৩-তে ফোন করেছিলাম। এখন আমার কী থেকে কী হয়ে গেলো।

শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার আত্নীয়-স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, যে কারখানায় কাজ করি তারা সবাই আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। এমনকি মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও সবাই এমনভাবে তাকায় যেন আমি অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি। এ কথা বলেই চোখ মুছতে থাকেন তিনি।’

ফরিদ আহমেদের স্ত্রী হিরণ বেগম জানান, ফরিদ আহমেদ ব্রেন স্ট্রোক করার কারণে মানসিকভাবে অসুস্থ। এখন তিনি এলোমেলো কথা বলেন। সাহায্য চেয়ে কি আমার স্বামী ভুল করেছেন, নাকি ভুল ইউএনওর হয়েছে, তা আল্লাহই জানেন।’

ফরিদ আহমেদের প্রতিবেশীরা বলছেন, ভালোভাবে না জেনে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। তার উচিত ছিল ফরিদ আহমেদের ব্যাপারে ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া।

১৯ মে বুধবার নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম দেওভোগ নাগবাড়ি এলাকার ফরিদ আহমেদ জাতীয় হট লাইন ৩৩৩-এ কল করে খাদ্য সহায়তা চান। উপজেলা প্রশাসন থেকে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আয়ুব আলী ফরিদ আহমেদকে বাসায় এসে বলেন আপনি এই খাদ্য সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত নন। এ ছাড়া তাকে নানাভাবে ধমকান। এর কিছুক্ষণ পরেই সেখানে গিয়ে হাজির হন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা। এ সময় ইউপি মেম্বার তাকে শিখিয়ে নিয়ে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে।

বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে ওই বাড়িতে যান। এ সময় ফরিদ আহমেদকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কি এই চারতলা বাড়ির মালিক?’। তিনি স্বীকার করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকারি কাজের সময় নষ্ট করায় শাস্তি হিসেবে গরীব ১০০ জনকে ১০০ প্যাকেট খাদ্য সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন এবং দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়ে আসেন। ২১ মে শুক্রবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজে গিয়ে সেই খাদ্য সহায়তা গরীব মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন।

ওই চার তলা বাড়িটি ফরিদ আহমেদের পৈতৃক সম্পত্তি। তারা ছয় ভাই এবং এক বোন উত্তরাধিকারী সূত্রে এই বাড়ির মালিক। ফরিদ আহমেদ তিন তলার ওপর ছাদে টিনশডে দুটি রুম ও নিচ তলায় একটি রুম পেয়েছেন। অন্যগুলো বাকি পাঁচভাই বসবাস করেন।

ফরিদ আহমেদ বলেন, তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি একটি হোসিয়ারি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। যেখানে তিনি সপ্তাহে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পান। ফলে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়ির একাংশের মালিক হলেও, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র এবং ত্রাণ তার সত্যিই দরকার ছিল।

কিন্তু ইউএনওর দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী একশ জনকে ত্রাণ দিতে তার ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকা জোগাড় করতে তার বেশ কষ্ট হয়েছে। এজন্য তাকে মেয়ের গয়না বন্ধক রাখতে হয়েছে এবং কর্জ করতে হয়েছে। এই ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। এদিকে, এই ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শামীম ব্যাপারী জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করা হবে।

অন্যদিকে গত রোববার প্রশাসনের অনুরোধে স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির প্রধান ব্যবসায়ী শাহনুর আলম শাস্তি পাওয়া ফরিদ আহমেদ ও তার স্ত্রী হিরন বেগমকে বাসায় ডেকে এনে একটি মুচলেকাপত্রে লিখিত রেখে হাতে ৬০ হাজার টাকা তুলে দেন। শাহনুর আলম দাবি করেন, তিরি তার নিজস্ব তহবিল থেকে এই টাকা অনুদান দিয়েছেন।

ফরিদ আহমেদ জানান, শাহনুর আলম একটি কাগজে মুচলেকা নিয়ে নগদ ৬০ হাজার টাকা দেন। কাগজে লেখা ছিল আমি নিজে ভুল তথ্য উপস্থাপনের জন্য এই শাস্তি পেয়েছি। তবে শাহনুর আলম মুচলেকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close