হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ কী? উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ কী? উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়

জীবন খুব দ্রুত ছুটে চলেছে । আমরা ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়ছি । মানুষে মানুষে সম্পর্কগুলো থিতিয়ে পড়ছে ক্রমশঃ। “পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা /একসাথে নয় আসলে যে একা” । আর এই একাকীত্ব থেকেই বাড়ছে ডিপ্রেশন , নানারকম টেনশন , উড়ে যাচ্ছে ঘুম । এভাবেই শরীরে বাসা বাড়ছে সাইলেন্ট কিলার হাই ব্লাড প্রেসার । আসুন আজ আমরা জেনে নিই হাই ব্লাড প্রেসার কী? উচ্চরক্তচাপের কারণ, লক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলি সম্বন্ধে।

হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ কী ? হাইপারটেনশন বা হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ একটি জটিল দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) স্বাস্থ্যগত সমস্যা যার ফলে শরীরের রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। একে সাইলেন্ট কিলারও বলা হয়ে থাকে। হৃৎপিণ্ডের ধমনীতে রক্ত প্রবাহের চাপ অনেক বেশি থাকলে সেটিকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেসার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।সিস্টোলিক প্রেসার ও ডায়াস্টলিক প্রেসার কী ?

দু’টি মানের মাধ্যমে এই রক্তচাপ রেকর্ড করা হয় – যেটার সংখ্যা বেশি সেটাকে বলা হয় সিস্টোলিক প্রেশার, আর যেটার সংখ্যা কম সেটাকে বলা হয় ডায়াস্টলিক প্রেশার। প্রতিটি হৃৎস্পন্দন অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সংকোচন ও সম্প্রসারণের সময় একবার সিস্টোলিক প্রেশার এবং একবার ডায়াস্টলিক প্রেশার হয়।স্বাভাবিক অবস্থায় রক্ত চাপের পরিমাপ :- একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের রক্তচাপ থাকে ১২০/৮০ মিলিমিটার মার্কারি। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ খানিকটা বাড়তে থাকে। তখন এই পরিমাপের থেকে আর একটু বেশি চাপকেও স্বাভাবিক বলে ধরা হয়।

কীভাবে বুঝবেন রক্তচাপ বেড়েছে :- কারও ব্লাড প্রেশার রিডিং যদি ১৪০/৯০ বা এর চেয়েও বেশি হয়, তখন বুঝতে হবে তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে। উপরের চাপ মানে সিস্টোলিক ১৪০-এর বেশি,নীচের রক্ত চাপ তথা ডায়াস্টোলিক ৯০-এর বেশি হয় তাহলে সেটি মুশকিল।এই অবস্থাটাকে হাই ব্লাড প্রেসার বলে। লো ব্লাড প্রেসার বুঝবেন কীভাবে ? রক্তচাপ যদি ৯০/৬০ বা এর আশেপাশে থাকে, তাহলে তা লো ব্লাড প্রেসার বা নিম্ন রক্তচাপ হিসেবে ধরা হয়।

কী কী কারণে উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায় ?
৯০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, একে প্রাইমারি বা অ্যাসেনশিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে ব্যাপারটা বংশগত৷ তবে অনেকের ক্ষেত্রে জীবনযাপনের কারণেই উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায়৷ যেমন, ওবেসিটি বা ওজন বৃদ্ধি,বেশী লবন গ্রহণ,ওভার থিঙ্কিং,

টেনশন, হতাশা, রাত্রি জাগরণ, অতিরিক্ত মদ্যপান,দৈনিক খাদ্য তালিকায় অনেক বেশি ক্যাফেইন জাতীয় খাদ্য থাকা,খাদ্য তালিকায় অধিক চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহন করলে,গর্ভধারণ অবস্থায় একলাম্পসিয়া ও প্রি এ্যাকলাম্পসিয়া হলে। এছাড়া থাইরয়েডের সমস্যা, কিডনির সমস্যা, এক নাগাড়ে পেন রিলিভার ট্যাবলেট খাওয়ার ফলেও এই প্রবণতা দেখা দেয়। এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ দেখা যায়৷

হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ বা উপসর্গ :- উচ্চ রক্তচাপের একেবারে সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষণ সেভাবে প্রকাশ পায় না। বিভিন্ন সময়ে মানুষের হাই প্রেসারের লক্ষণ কিছুটা দেখা যায়। আর এই লক্ষণ প্রতিটি মানুষের একই রকম নয়। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণের মধ্যে রয়েছে।

বুক ধড়ফড় করা। মনোযোগের অভাব।
ক্লান্তি।হাঁপিয়ে ওঠা।মাংসপেশীর দুর্বলতা।পা ফোলা।বুকব্যথা।নাক দিয়ে রক্ত পড়া।প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করা।মাথা গরম হয়ে যাওয়া এবং মাথা ঘোরানো।ঘাড় ব্যথা করাবমি বমি ভাব বা বমি হওয়াঅল্পতেই রেগে যাওয়া বা অস্থির হয়ে শরীর কাঁপতে থাকারাতে ভালো ঘুম না হওয়ামাঝে মাঝে কানে শব্দ হওয়া
অনেক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলাকিডনিজনিত রোগ, কিছু হরমোনাল রোগ, কিছু রক্তনালির রোগ ইত্যাদি।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করতে এবং ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।উচ্চ রক্তচাপ হলে কী সমস্যা তৈরি হয় ?বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা জানাচ্ছে, ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বয়স ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে হলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন। আর পঞ্চাশের কোঠায় বয়স হলে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন প্রতি ১০ জনে ৫ জন। বয়স ৭০ বা তার বেশি হলে প্রতি দুই জনের মধ্যে এক জনের উচ্চ রক্তচাপ থাকবে। উচ্চ রক্তচাপ হলে হলে কঠিন কয়েকটি সমস্যা তৈরি পারে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গে জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং এর ফলে দুর্বল হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে না পেরে ব্যক্তির হৃতপিণ্ড কাজ বন্ধ করতে পারে বা হার্ট ফেল করতে পারে। এছাড়া, এমন সময় রক্তনালীর দেয়াল সঙ্কুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও থাকে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, মস্তিষ্কে স্ট্রোক বা রক্তক্ষরণও হতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে।

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হল, এই রোগের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। লক্ষণ না থাকলেও দেখা যায় শরীরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে এবং রোগী হয়তো বুঝতেই পারেন না যে তার মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা বেশি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বয়স ৪০ হওয়ার পর থেকে কয়েক মাস অন্তর ব্লাড প্রেসার মাপা দরকার বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আর যারা দীর্ঘ দিন ধরে রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের প্রতি সপ্তাহে একবার প্রেসার মেপে দেখা উচিত। বাড়িতেই রাখতে পারেন প্রেসার মাপার যন্ত্র। রক্তচাপ নির্ণয় করার যন্ত্রকে ইংরেজিতে বলা হয় স্ফিগমোম্যানোমিটার (sphygmomanometer)। বাজারে ডিজিটাল ও অ্যানালগ দুই ধরনের যন্ত্র পাওয়া যায়। এছাড়া একটি স্টেথেস্কোপও লাগবে। এছাড়া ঘরে বসেই আপনি অতি সহজেই মেপে দেখে নিতে পারেন অতি সরল ডিজিটাল স্ফিগমোম্যানমিটার দিয়ে ।

অনলাইনে অর্ডারও করতে পারেন । ডিজিটাল যন্ত্র যে সবসময় সঠিক পাঠ দেবে এমনটা বলা যায় না । তবে ব্লাড প্রেসার মাপার সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে । যেমন – পাঁচ-দশ মিনিট বিশ্রাম করার পর প্রেসার মাপতে হবে । চেয়ারে সোজা হয়ে বসে , হাতটি হৃৎপিণ্ডের সম উচ্চতায় রাখতে হবে । কাপটি কনুইয়ের একটু উপরে মাঝারি টাইট করে বাঁধতে হবে । এভাবে প্রেসার মাপলে অনেকটাই সঠিক রিডিং পাবেন । তবে একবার রক্তচাপ বেশি দেখা গেলেই যে কারও উচ্চ রক্তচাপ আছে, সেটা বলা যাবে না। পর পর তিন মাস যদি কারও উচ্চ রক্তচাপ দেখা যায়, তখনই বলা যাবে যে তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপায় :- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কয়েকটি উপায় নীচে আলোচনা করা হল

:-

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker