আখের রস এর ১৪ টি স্বাস্থ্যউপকারীতা ও পুষ্টিগুন

তীব্র গরমে এক গ্লাস আখের রস যেন নিমিষেই ক্লান্তি দূর করে দ্রুত শরীরকে চাঙা করে দিতে পারে। প্রচন্ড গরমে তাই বেশিরভাগ পথিকই রাস্তার পাশ থেকে এক গ্লাস আখের রস খেয়ে ক্লান্তি দূর করতে ভোলেন না। খুব সম্ভবত এই কারনেই আখের রসকে “প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকস” ও বলা হয়। আজ আমরা জানবো প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংকস “আখের রস” এর স্বাস্থ্যউপকারীতে সম্পর্কে।আখের রস কি?আখ মূলত ঘাস জাতীয় বহুবর্ষজীবী একটি উদ্ভিদ।

যন্ত্র ব্যবহার করে আখ গাছের লম্বা কাণ্ডের ভিতরে থাকা যে মিষ্টি রস পিষে বের করা হয় সেটাকে মূলত আখের রস।যা দিয়ে সাধারণত গুড় ও চিনি তৈরি করা হয়।পুষ্টিগুন ও ঔষধিগুনের চাহিদা ছাড়াও উচ্চফলনশীলতা ও অর্থনৈতিক কারনে বিশ্বের প্রায় ৯০ টি দেশে আখের চাষ হয়ে থাকে। আখের চাষ প্রথমে দক্ষিণ এশিয়া শুরু হয়ে থাকলেও বর্তমান এর চাষ ক্রমশ সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পরেছে। আখের পুষ্টিগুনঃপরিশোধিত চিনির চাইতে আখের রসে অধিক পরিমাণে ভিটামিন এবং খনিজ থাকে।এছাড়াও অল্প পরিমাণে আয়রন,ক্যালসিয়াম,পটাসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম,ভিটামিন বি১ (থায়ামিন)ও থাকে। আখের রসে আরো থাকে পর্যাপ্ত পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, ১০০ গ্রাম আখের রসে কি কি পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়,শক্তি – 33 kcalপানি – 91.7 gmপ্রোটিন – 0.7 gmকার্বোহাইড্রেট – 7.5 gmক্যালসিয়াম – 8 mgআয়রন – 1.1 mgম্যাগনেশিয়াম – 10 mg
ফসফরাস – 6 mgপটাশিয়াম – 25 mgসোডিয়াম – 7 mgজিঙ্ক – 0.01 mgকপার – 0.06 mgথায়ামিন – 0.04 mg আখের রস এর স্বাস্থ্যউপকারীতাঃ১) প্রাকৃতিক চিনি হিসেবে কাজ করেঃআখের রসের স্বাস্থ্য উপকারীতা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই অবগত নন।

আখের রসে ১৫% প্রাকৃতিক চিনি রয়েছে যা মানবদেহকে সতেজ রাখতে সহায়তা করে এবং তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদান করে। এক কাপ বা ২৪০ মিলি আখের রসে ৫০ গ্রাম চিনি থাকে যা প্রায় ১২ টেবিল চামচ চিনির সমান।২) ঔষুধ হিসেবে কাজ করেঃআখের রস মানবদেহের বিভিন্ন রোগব্যাধি নিরাময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন কাল থেকেই ভারতে আর্য়ুবেদ এবং ইউনানি পদ্ধতিতে এটিকে ঔষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কখনও একক ঔষুধ হিসেবে কখনও বা এর সাথে উদ্ভিদজাত পন্যের সংমিশ্রণ করে ঔষুধ তৈরী করা হয়। এছাড়া এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।৩) হজমে সহায়তা করেঃআখের রসে উপস্থিত পটাশিয়াম পরিপাক তন্ত্রকে সঠিকভাবে কাজ করতে এবং হজম ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পাকস্থলির পিএইচ স্তরের ভারসাম্য বজায় রাখে। এমনকি এটি পেটের সংক্রমণ রোধে সহায়তা করার পাশাপাশি পাকস্থলীর বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধেও কাজ করে।

৪) মূত্রনালীর জ্বালাপোড়া কমায় আখের রসঃ মূত্রবর্ধক উপাদান থাকায় আখের রস কিডনিকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। নিয়মিত আখের রসে পান মূত্রের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ফলে দেহ থেকে অতিরিক্ত লবন ও পানি অপসারিত হয়ে যায় এবং মূত্রাশয়ের প্রবাহ পরিষ্কার হয়। চুন এবং নারিকেল এর পানির সাথে এটি মিশিয়ে খেলে প্রসাবের সমস্যার কারনে মূত্রনালীতে যে জ্বালাপোড়া হয় তা কমে যায়। অর্থাৎ মূত্রনালীর জ্বালাপোড়ার সমস্যা সমাধান হয়। এছাড়াও এটি সাধারণত মূত্রনালীর সংক্রমণ, যৌন সংক্রমিত রোগ এবং কিডনি পাথারের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।৫) আখের রস ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়ঃ আখের রসে পর্যাপ্ত পরিমাণে মিনারেলস থাকে যেমন, ক্যালসিয়াম,পটাশিয়াম , ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং উচ্চ ঘনত্বের ম্যাঙ্গানিজ। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, আখের মধ্যে উপস্থিত ফ্ল্যাভোনয়েড স্তন্যপায়ী গ্রন্থিতে ক্যান্সার কোষের সংখ্যাবৃদ্ধিতে বাধা দেয়। ৬) দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করেঃ আখের রসে উচ্চ পরিমানে খনিজ উপাদান থাকে যা দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে দারুন কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
আখের রসে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস দাঁতের এনামেল তৈরীতে সাহায্য করে।

৭) তারুণ্য ধরে রাখতে সহায়তা করে আখের রসঃআলফা হাইড্রোক্সি এসিড ব্রনের সাথে লড়াই করে ব্রনের দাগ দূর করতে এবং তারুণ্য ধরে রাখতে সক্ষম। এছাড়াও এটি ত্বককে মসৃণ রাখতে সহায়তা করে। অন্যতম কার্যকরী একটি আলফা হাইড্রোক্সি এসিড হল গ্লাইকোলিক এসিড যা আখের রসে পওয়া যায়।এটি গ্লাইকোলিক এসিডের কয়েকটি প্রাকৃতিক উৎসগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ উৎস হিসেবে বিবেচিত।তাই নিয়মিত এই রস পান ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি কমায় বিশেষ করে প্রস্টেট ও স্তন ক্যান্সার।৮) আখের রস লিভারের ক্রিয়াকলাপে সাহায্য করেঃজন্ডিস ও লিভারের সাথে সম্পর্কিত ব্যাধি প্রতিরোধে সাহায্য করে। বিলিরুবিন লেভেলগুলি নিয়ন্ত্রণ করে যকৃতকে ভালো রাখতে পারে। পরিমানমত আখের রস গ্রহন জন্ডিস থেকে তাৎক্ষণিক উপশম লাভ করতে সহায়তা করে।৯) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়ঃআখের রস সংক্রমণ থেকে সহজাত অনাক্রম্যতা বাড়াতে জৈবিক প্রভাব ফেলে।সহজাত অনাক্রম্যতা হল এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা সমস্ত অ্যান্টিজেন থেকে দেহকে রক্ষা করে এবং দেহে ক্ষতিকারক পদার্থ প্রবেশ করতে বাধা দেয়। বিভিন্ন জীবানুর সংক্রমন নিয়ন্ত্রণ করে এবং আপনার শরীরকে সম্পূর্ন সুস্থ রাখে। প্রাকৃতিক ঘাতক কোষ মাইক্রোফেজ এবং নিউট্রোফিলস এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থাও গড়ে তোলে।

১০) কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করেঃআখের রস আ্যাফ্রোডিসিয়াক বা যৌন উদ্দীপক, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধী, মানসিক বেদনা উপশমকারী, অ্যান্টিসেপটিক এবং শক্তিদায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এটি দেহের দূর্বলতার ভাব কমায়।১১) অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎসঃ আখের রস অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইমিউন সিস্টেম তৈরীতে এবং বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো ফ্রি রেডিকেল ( যা কোষের ক্ষতি করে) এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। ফ্রি-রেডিকেল এর কারনে সৃষ্ট স্কিন ক্যানসার এর মত রোগের সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করে আখের রসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এছাড়াও ডিএনএ সুরক্ষায় এবং মানবদেহের স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এটি। ১২) হাইড্রেটেড রাখতে সহায়তা করেঃ আখের রসে ইলেকট্রোলাইট যেমন পটাশিয়াম থাকায় ক্রিয়াবিদদের জন্য এটি দারুন উপকারী। এটি দেহকে হাইড্রেট রাখে এবং অনুশীলনের সময় রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে এবং শক্তি সংরক্ষণে পেশিগুলোকে সহায়তা করে।এছাড়াও আখের রসে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি থেকে। ১০০ গ্রাম আখের রস থেকে ৯১.৭ গ্রাম পানি পাওয়া যায়। ১৩) জ্বয়জনিত রোগ নিরাময় করেঃ আখের রস জ্বয়জনিত রোগ নিরাময় অত্যন্ত উপকারী বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে।
শিশুদের জ্বর জ্বর ভাব বা কম বেশি জ্বরের ফলে দেহে প্রোটিন এর ঘাটতি দেখা দেয় এই অবস্থায় এটি প্রোটিনের ঘাটতি দূর করে এর চাহিদা পূরন করতে সক্ষম।১৪) আখের রস এনার্জি বুস্টার হিসেবে কাজ করেঃআখের রস তৎক্ষনিক এনার্জি বুস্টার হিসেবে কাজ করে।আপনি যদি হঠাৎ ডিহাইড্রেশন এ ভুগতে থাকেন এমন অবস্থায় এক গ্লাস রস পান আপনার শরীরের পানির চাহিদা মিটিয়ে আপনাকে তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদান করবে। এবং সতেজ অনুভব করাবে।

এতে সিম্পল সুগার সুক্রোজ থাকায় এটি আপনার শরীরের শর্করার চাহিদা মেটাতেও কাজ করবে।
আখের রস গ্রহনের ক্ষেত্রে সর্তকতাঃ১) আখের রস গ্রহণ গর্ভবতী মহিলাদের হজম ক্ষমতা ত্বরান্বিত করে এবং সকালের অসুস্থতা দূর করতে সহায়তা করে। যেহেতু চিনি কে ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয় তাই এটি গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মহিলাদের ওজন বৃদ্ধি পায়। আদা দিয়ে এই রস গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মহিলাদের সকালের অসুস্থতার প্রকোপ হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।২) যেহেতু আখের রস প্রাকৃতিক চিনির উৎস।তাই আপনি যদি ডায়াবেটিস এর মতো রোগে ভুগতে থাকেন তাহলে এই পানীয় আপনার পান না করাই ভালো।৩) উচ্চ শর্করা সমৃদ্ধ খাবার বা পানীয় উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি রোগের সাথে সম্পর্কিত।যদিও এটি থেকে সব প্রাকৃতিক পুষ্টি উপাদানই পাওয়া যায়। তারপরও অতিরিক্ত পান করা থেকে বিরত থাকাই উচিত।প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন খাবার বা পানীয় গ্রহণ আমাদের শরীরের জন্য ভালো নয়।এতে করে আমরা খাবার/ পানীয় গ্রহণের ফলে উপকারীতার তুলনায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরার সম্ভবনায় বেশি থাকবো।তাই খাবার বা পানীয়, যাই গ্রহণ করি না কেন তা যেন নির্দিষ্ট পরিমানে হয় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত। আর দৈনন্দিন স্ট্রেস, ক্লান্তি থেকে বাঁচতে খেতেই পারেন আখের রস। কিন্তু সেটিও অবশ্যই পরিমান মতো হতে হবে।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button
Close
Close